ফার্মগেট বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছি। গন্তব্য যাত্রাবাড়ী। একের পর এক বাস আসছে, আর পিলপিল করে মানুষ উঠছে। আমার সামনে একটা বাস এসে থামল। বাসের গায়ের রং চটা, জানালার কাচ অর্ধেক ভাঙা, কিন্তু হেলপার চিৎকার করে ডাকছে— "আইসেন মামা, ডাইরেক্ট যাত্রাবাড়ী! সিট খালি, গেট লক!"
আমি বিশ্বাস করে বাসে পা রাখলাম। কিন্তু ভেতরে ঢুকে দেখি তিল ধারণের জায়গা নেই। মানুষে মানুষে ঠাসাঠাসি, এমনকি ইঞ্জিনের ওপরের বনেটটাতেও পাঁচজন বসে আছে।
আমি হেলপারকে বললাম, "মামা, সিট খালি বললেন যে? এখানে তো দাঁড়ানোর জায়গাই নেই! আর গেটলক সার্ভিস বললেন কেন, মোড়ে মোড়ে তো লোক তুলছেন!"
হেলপার ঝুলে ঝুলে দরজায় তালি মারতে মারতে বলল, "আরে মামা, রাগ করেন কেন? বাসের ভেতরে তো সিট আছেই, নাকি নাই? আমি তো বলি নাই যে সিটগুলা 'ফাঁকা' আছে। আমি বলছি সিট আছে! আর গেট লক মানে তো বোঝেনই—গেট আটকানো যাচ্ছে না দেইখা আমি হাত দিয়া ধইরা রাখছি, এইটাই তো ম্যানুয়াল গেটলক!"
আমি কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম। বাসটি প্রতি দুই হাত পরপর থামছে আর হেলপার নতুন যাত্রী তোলার জন্য কসরত করছে। আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, "ভাই, এইভাবে যদি লোক তুলতেই থাকেন, তবে বাস তো আর সামনে বাড়বে না। জ্যামের মধ্যে আমাদের সময় নষ্ট হচ্ছে কেন?"
হেলপার এবার আমার দিকে বড় বড় চোখে তাকিয়ে বলল, "মামা, ঢাকা শহরে বাসের কাম হইলো মানুষ নেওয়া। বাস যদি খালি যায়, তবে বাসের মনে কষ্ট লাগে না? আমরা তো বাসের ইমোশন বুঝি। আর আপনি যে জ্যামের কথা বলছেন, এইটা তো জ্যাম না—এইটা হইলো 'রোড সাইড রেস্ট'। ইঞ্জিনেরও তো একটু জিরানোর দরকার আছে, নাকি?"
আমি অবাক হয়ে বললাম, "ইঞ্জিন জিরানোর জন্য রাস্তার মাঝখানে বাস থামিয়ে রাখবেন?"
হেলপার এবার আমার কাঁধে হাত দিয়ে পরম মমতায় বলল, "মামা, আপনারা শহরবাসী শুধু দৌড়াইতে জানেন। একটু থামতে শেখেন। আমরা আপনাদের ধৈর্য পরীক্ষা নিচ্ছি যাতে ভবিষ্যতে বড় কোনো বিপদে আপনারা ঘাবড়ায়ে না যান। আপনি তো দেখি উল্টা আমাদের ওপর চিল্লাইতাছেন!"
উনার এই 'বাসের ইমোশন' আর 'ধৈর্য পরীক্ষার' তত্ত্ব শুনে আমার মনে হলো—আমি আসলে কত বড় এক অকৃতজ্ঞ! উনারা আমার চরিত্র গঠনের জন্য এত বড় ত্যাগ স্বীকার করছেন, আর আমি কি না সময়ের হিসেব করছি! নিজের ক্ষুদ্র মানসিকতার জন্য লজ্জিত হয়ে বললাম—
"ও আচ্ছা ভাই... সরি!"
বাস স্ট্যান্ডের মরীচিকা