সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে পা রাখা মানেই হচ্ছে নিজেকে পুরোপুরি অন্যের হাতে সঁপে দেওয়া। আমি হাতে মাত্র একটা মাঝারি সাইজের ব্যাগ নিয়ে শান্তিতে লঞ্চে ওঠার চেষ্টা করছিলাম। হঠাৎ কোত্থেকে বিদ্যুৎবেগে এক লোক এসে আমার ব্যাগটা হ্যাঁচকা টানে ছিনিয়ে নিল।

আমি চিৎকার করে বললাম, "আরে ভাই! করেন কী? আমার ব্যাগ ছাড়েন, আমি নিজেই নিতে পারবো।"

ব্যাগধারী কুলি আমার দিকে এমন চোখে তাকাল যেন আমি তার পৈতৃক সম্পত্তি চুরি করেছি। পাশ থেকে একজন লুঙ্গি পরা লোক—যিনি সম্ভবত এই ঘাটের অলিখিত অধিপতি—এসে গম্ভীর গলায় বললেন, "চিল্লাইতাছেন কেন মিয়া? ঘাটে আইছেন নিয়ম জানবেন না? ব্যাগ উনি নিছে মানে উনিই নিবে। এইটা ঘাটের ইজারা নেওয়া লোকজনের হক।"

আমি অবাক হয়ে বললাম, "ভাই, ব্যাগ আমার, হাত আমার, শক্তিও আমার। আমি কেন অহেতুক টাকা দিয়ে অন্যকে দিয়ে ব্যাগ নেওয়াব? আর ব্যাগ তো ভারীও না!"

ইজারাদার সাহেব এবার পানের পিক ফেলে আমাকে জ্ঞান দিতে শুরু করলেন, "দেখেন ভাই, আপনে ব্যাগ নিজে বহন করা মানে হইলো এই শ্রমজীবী মানুষের পেটে লাথি মারা। আমাদের সিন্ডিকেট এইখানে একটা সিস্টেম করছে—যাতে মানুষের ব্যায়াম হয়। আপনি খালি হাতে হাঁটবেন, আর আপনার ব্যাগ অন্য কেউ নিবে। এতে সম্পদের সুষম বণ্টন হয়। আপনের পকেটের টাকা ওনার পকেটে যাবে, তবেই না অর্থনীতি সচল থাকবে!"

আমি দমে গেলাম না। বললাম, "ঠিক আছে, উনি যদি ব্যাগ লঞ্চের কেবিন পর্যন্ত পৌঁছায় দেয়, তবে বিশ-পঞ্চাশ টাকা দিতাম। কিন্তু উনি তো ব্যাগ নিয়ে মাত্র দশ কদম দূরে রেখে পাঁচশ টাকা দাবি করতেছেন! এইটা কেমন বিচার?"

ইজারাদার সাহেব এবার আমার কাঁধে হাত দিয়ে পরম মমতায় বললেন, "আরে ভাই, এইটা তো সার্ভিস চার্জ না, এইটা হইলো 'দর্শন ফি'। উনি যে আপনার ব্যাগটা স্পর্শ কইরা ধন্য করছেন, সেইটার দাম আছে না? আর এই যে আমরা সিন্ডিকেট কইরা ঘাটে একটা থমথমে পরিবেশ বজায় রাখছি যাতে চোর-পকেটমার ভয় পায়, সেই সিকিউরিটি চার্জ কে দিবে? আপনি তো দেখি শুধু নিজেরটাই বোঝেন, ঘাটের উন্নয়ন বোঝেন না!"

উনার এই 'অর্থনীতি সচল রাখা' আর 'স্পর্শ ফি'র যুক্তি শুনে আমার নিজের বিবেক দংশন শুরু হলো। আমি যে এতই স্বার্থপর যে শ্রমজীবী মানুষের 'স্পর্শের মূল্য' দিতে চাইছি না, তা ভেবে লজ্জিত হলাম। পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করতে করতে বললাম—

"ও আচ্ছা ভাই... সরি!"