বেকার পকেটের ওপর তখন টানাপোড়েন চলছে, ঠিক তখনই নামকরা এক প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি এল। পদের নাম 'অফিস সহকারী', কিন্তু আবেদন ফি ধরা হয়েছে এক হাজার টাকা। সারা রাত নির্ঘুম কাটিয়ে বন্ধুদের কাছ থেকে ধারদেনা করে টাকাটা জমা দিলাম। পরীক্ষার হলে গিয়ে দেখি আমার মতো আরও কয়েক হাজার 'সহকারী' হওয়ার স্বপ্নে বিভোর।
পরীক্ষার হল থেকে বের হতেই গেটের সামনে এক ভদ্রলোকের দেখা পেলাম, যিনি এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার অন্যতম হোতা। আমি বেশ সাহস করে জিজ্ঞেস করলাম, "ভাই, আপনাদের তো নিজেদের লোক দরকার, আপনারাই লোক খুঁজছেন। সেখানে আমাদের মতো বেকারদের কাছ থেকে এই হাজার হাজার টাকা ফি নেওয়ার মানে কী? পরীক্ষা নেওয়ার খরচ কি আপনারা বহন করতে পারেন না?"
ভদ্রলোক পকেট থেকে আইফোন বের করে সময় দেখলেন, তারপর একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললেন, "আরে ভাই, এইটা তো ফি না, এইটা হইলো আপনার 'ডেডিকেশন টেস্ট'!"
আমি অবাক হয়ে বললাম, "ডেডিকেশন টেস্ট মানে? টাকা দিলেই কি প্রমাণিত হয় আমি কাজের প্রতি ডেডিকেটেড?"
তিনি এবার বিজ্ঞের মতো মাথা নেড়ে বললেন, "অবশ্যই! যে ছেলে পকেটে টাকা না থাকার পরও ধার করে আমাদের এক হাজার টাকা দিতে পারে, তার মানে সে আমাদের কোম্পানির জন্য যেকোনো ঝুঁকি নিতে রাজি। আমরা তো আসলে আপনার মানসিক শক্তি পরীক্ষা করছি। আর এই যে হাজার হাজার মানুষের পরীক্ষা নিচ্ছি, এই যে বেঞ্চের ঘষাঘষি, ফ্যানের বাতাস—এগুলার কি একটা 'ডেপ্রিসিয়েশন কস্ট' নাই?"
আমি দমে না গিয়ে বললাম, "কিন্তু ভাই, আপনারা তো শেষমেশ আপনাদের নিজেদের পরিচিত লোকগুলোকেই নেবেন, এটা তো ওপেন সিক্রেট। তাহলে আমাদের এই গরিবের টাকাগুলো কেন নিচ্ছেন?"
ভদ্রলোক এবার আমার কাঁধে হাত দিয়ে পরম মমতায় এক নতুন অর্থনীতির থিওরি দিলেন, "দেখেন ভাই, আমরা যদি বিনে পয়সায় পরীক্ষা নিতাম, তবে তো ঢাকার সব বেকার এসে ভিড় করত। তখন কি আর পরীক্ষার হলের পবিত্রতা থাকত? আমরা ফি নিচ্ছি যাতে শুধু 'এলিট বেকার'রা এখানে আসতে পারে। আর আমরা যদি আমাদের পরিচিত লোক নিই, তবে আপনাদের ওই টাকাগুলো দিয়ে আমরা তাদের ওয়েলকাম লাঞ্চের ব্যবস্থা করি। পরোক্ষভাবে তো আপনি আপনার হবু কলিগের পেছনেই খরচ করছেন। এতে কি ভ্রাতৃত্ববোধ বাড়ে না?"
উনার এই 'এলিট বেকার' আর 'ভ্রাতৃত্ববোধের লাঞ্চ' থিওরি শুনে আমার বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। আমি যে উনাদের এই মহান কর্পোরেট চ্যারিটি বুঝতে না পেরে নিজের এক হাজার টাকার মায়া করছি, সেই সংকীর্ণমনা চিন্তার জন্য লজ্জিত হয়ে বললাম—
"ও আচ্ছা ভাই... সরি!"