সারা দিন অফিস করে ক্লান্ত শরীরে বাসায় ফিরলাম। আমাদের বিল্ডিংটা দশ তলা, আমি থাকি নয় তলায়। লিফটের সামনে গিয়ে দেখি সেটা সাত তলায় আটকে আছে। অনেকক্ষণ বোতাম চেপে রাখার পর লিফটটা যখন নিচে নামল, ভেতর থেকে লিফটম্যান কাম কেয়ারটেকার মোতালেব ভাই হাই তুলতে তুলতে বের হলেন।

আমি ভেতরে ঢুকতে যাব, এমন সময় তিনি হাত দিয়ে আমাকে থামিয়ে দিলেন। বললেন, "ভাই, এখন তো লিফট চলবে না। বিরতি!"

আমি অবাক হয়ে ঘড়ির দিকে তাকালাম। "বিরতি মানে? এখন তো সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা। মানুষ অফিস থেকে ফিরছে, এখন লিফট বন্ধ কেন?"

মোতালেব ভাই পকেট থেকে একটা বিড়ি বের করে কানে গুঁজে বললেন, "ভাই, লিফটেরও তো একটা জীবন আছে। সারাদিন ওঠানামা করতে করতে ওর মাথা ঘুরায় না? এখন ওর 'রেস্ট টাইম'। একটানা চললে লিফটের মেজাজ গরম হয়, তখন যদি মাঝপথে আটকায়ে দেয়, সেই রিস্ক কি আমি নিব?"

আমি মেজাজ সামলে বললাম, "ভাই, লিফট তো মেশিন, ওর আবার মেজাজ কী? আর নয় তলায় আমি এই ব্যাগ নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠব কীভাবে?"

তিনি এবার আমার দিকে করুণার দৃষ্টিতে তাকালেন। "ভাই, আপনারা শিক্ষিত মানুষ হইয়াও যদি ব্যায়ামের গুরুত্ব না বুঝেন, তবে ক্যামনে কী? সিঁড়ি দিয়া উঠলে হার্ট ভালো থাকে, পায়ের মাসল শক্ত হয়। আমরা তো আপনাদের জিমের টাকা বাঁচায়া দিচ্ছি। আর নয় তলা তো বেশি দূর না, মহাকাশ গবেষণায় তো মানুষ কয়েক হাজার মাইল উপরে যায়, আপনে সামান্য নয় তলা উঠতে পারতাছেন না?"

আমি বাকরুদ্ধ হয়ে বললাম, "ভাই, মহাকাশচারীরা রকেটে যায়, সিঁড়ি দিয়ে ওঠে না! আর আমি তো লিফট মেইনটেন্যান্সের জন্য প্রতি মাসে টাকা দেই।"

মোতালেব ভাই এবার চূড়ান্ত যুক্তিটা দিলেন, "ঐ টাকা তো দেন লিফটটা সাজায়া রাখার জন্য। লিফট যদি বেশি চলে তবে তো ওর আয়ু কমে যাবে। আমরা চাই এই লিফটটা যেন অন্তত কেয়ামত পর্যন্ত টিকে থাকে। আপনি কি চান আমাদের বিল্ডিংয়ের সম্পদ নষ্ট হয়ে যাক? একটু ত্যাগের মানসিকতা আনেন ভাই, সিঁড়ি দিয়া উঠলে সওয়াবও আছে।"

উনার এই 'লিফটের আয়ু' এবং 'মহাকাশ গবেষণা' তত্ত্ব শুনে আমি নিজের স্থূলতা আর অলসতার জন্য লজ্জিত বোধ করলাম। বিল্ডিংয়ের সম্পদ রক্ষা করার এই মহান উদ্যোগে বাধা দেওয়ার অপরাধে হাঁপাতে হাঁপাতে সিঁড়ির দিকে পা বাড়িয়ে বললাম—

"ও আচ্ছা ভাই... সরি!"