কুরবানির ঈদ সমাগত। পকেটে গামছা আর হাতে লাঠি নিয়ে গাবতলীর হাটে ঢুকেছি একখানা গরু কিনতে। চারদিকে বিকট গন্ধ আর মানুষের চিৎকার। এর মধ্যে এক বিক্রেতার সাথে অনেক দর কষাকষির পর একটা লাল রঙের গরু পছন্দ হলো। গরুটা নিজের কব্জায় নিয়ে যখন বের হতে যাব, তখনই উদয় হলেন তিন-চারজন যমদূত মার্কা সুঠামদেহী যুবক। তাদের প্রত্যেকের গলায় ঝোলানো রঙিন আইডি কার্ড, যাতে লেখা—'হাসিল আদায়কারী'।
আমি বেশ বিনয়ের সাথে বললাম, "ভাই, গরুর দাম তো মিটিয়ে দিয়েছি। এবার হাসিলটা কত দিতে হবে?"
উনাদের মধ্যে যিনি দলনেতা, তিনি আমার গরুর সাইজ না দেখে বরং আমার পকেটের পুরুত্ব মাপার চেষ্টা করলেন। তারপর একটা রসিদ বের করে বললেন, "ভাই, সরকারি রেট তো আছেই, তবে সাথে পাঁচ হাজার টাকা 'ঘাট খরচ' আর 'খুঁটি সেলামি' দিতে হবে।"
আমি আকাশ থেকে পড়লাম। বললাম, "বলেন কী ভাই! হাসিল তো নির্ধারিত শতকরা হার অনুযায়ী দেওয়ার কথা। এই ঘাট খরচ আর খুঁটি সেলামি আবার কোত্থেকে এল? আমি কি গরু নিয়ে নদী পার হচ্ছি নাকি?"
তিনি এবার আমার চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, "আরে ভাই, গরু তো আর আসমান থেকে পড়ে নাই। এই যে গরুটা গত দুইদিন এখানে খুঁটির সাথে বাঁধা ছিল, ওই খুঁটির কি একটা মান-সম্মান নাই? খুঁটি কি আর বিনে পয়সায় গরু ধরে রাখে? আর ঘাট খরচ মানে হইলো এই যে আমরা এই কাদা-ময়লার মধ্যে দাঁড়িয়ে আপনারে সেবা দিচ্ছি, আমাদের এই ঘামের দাম কি দিবেন না?"
আমি কাচুমাচু হয়ে বললাম, "ভাই, সেবাতো করলেন ইজারাদাররা। আপনারা তো মাত্র রসিদ কাটছেন। আর গরুর দাম যা, তার ওপর এই বাড়তি টাকা দিলে তো আমার বাজেট শেষ হয়ে যাবে!"
ভদ্রলোক এবার আমার পিঠে হাত দিয়ে দার্শনিকের মতো এক বক্তৃতা শুরু করলেন, "শোনেন ভাই, কুরবানি মানে হইলো ত্যাগ। আপনি যদি হাসিল দিতে গিয়ে কার্পণ্য করেন, তবে ত্যাগের মহিমা কোথায় থাকল? আমরা তো আসলে আপনার সওয়াব বাড়িয়ে দিচ্ছি। আপনি যত বেশি হাসিল দিবেন, আপনার গরু তত বেশি নেকি কামাবে। আর এই যে আপনি গরুর বদলে একটা উটের সমান টাকা খরচ করছেন, এতে কি আপনার স্ট্যাটাস বাড়ছে না?"
আমি থতমত খেয়ে বললাম, "কিন্তু ভাই, এটা তো জুলুম! গরু কিনলাম আশি হাজারে, আর আপনারা হাসিল চাচ্ছেন দশ হাজার?"
তিনি এবার একটু গম্ভীর হয়ে বললেন, "ভাই, এইটা জুলুম না, এইটা হইলো 'বাজার নিয়ন্ত্রণ'। আমরা যদি দাম বেশি না রাখি, তবে তো ঢাকার সব মানুষ গরু কিনে ফেলবে। তখন কি আর হাটে গরু পাওয়া যাবে? আমরা আসলে গরু সংরক্ষণ করছি যাতে দেশের পশুপদ সম্পদ শেষ না হয়ে যায়। আপনি কি চান দেশ গরুশূন্য হয়ে যাক?"
উনার এই 'জাতীয় সম্পদ রক্ষা' আর 'খুঁটির মান-সম্মান' তত্ত্ব শুনে আমার জ্ঞানচক্ষু চড়কগাছ হয়ে গেল। আমি যে উনাদের এই মহান দেশপ্রেম আর আধ্যাত্মিক ত্যাগের তত্ত্ব বুঝতে না পেরে তর্কে জড়িয়েছি, সেই অপরাধে নিজেকে ধিক্কার দিলাম। পকেট থেকে শেষ সম্বলটুকু বের করে দিতে দিতে বললাম—
"ও আচ্ছা ভাই... সরি!"
হাসিল-নামা ও উটের তত্ত্ব