বর্ষা আসার ঠিক আগেই ঢাকা শহরের সিটি কর্পোরেশনের টনক নড়ে। আমার বাসার সামনের রাস্তাটা গতকাল পর্যন্ত বেশ পরিষ্কার ছিল, কিন্তু আজ সকালে বের হয়ে দেখি রাস্তার দু’ধারে কালো রঙের ছোট ছোট পর্বতমালা তৈরি হয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে ড্রেনের নিচে যে বিচিত্র বস্তুগুলো সংসার পেতেছিল, তাদের আজ জনসমক্ষে আনা হয়েছে।

কালো কুচকুচে সেই কাদা আর ময়লার স্তূপ থেকে এক বিচিত্র সুঘ্রাণ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। আমি নাকে রুমাল দিয়ে কোনোমতে লাফিয়ে লাফিয়ে এগোচ্ছিলাম। পাশেই নীল রঙের গেঞ্জি পরা এক পরিচ্ছন্নতা কর্মী হাতে একটা লম্বা লাঠি নিয়ে ড্রেনের ভেতর থেকে প্রাগৈতিহাসিক সব বর্জ্য তুলে রাস্তার ওপর পরম মমতায় রাখছিলেন।

আমি কৌতূহল সামলাতে না পেরে জিজ্ঞেস করলাম, "ভাই, এই ময়লাগুলো তুলে রাস্তার ওপরই রাখছেন কেন? এটা তো ড্রেন থেকে আবার ড্রেনেই চলে যাবে, আর মানুষের হাঁটাচলার বারোটা বাজছে।"

ভদ্রলোক আমার দিকে এমন এক দার্শনিক দৃষ্টিতে তাকালেন যেন আমি মহাবিশ্বের গূঢ় রহস্য বুঝতে অক্ষম। তিনি লাঠিটা ড্রেনের পাশে রেখে বললেন, "আরে ভাই, এইটা তো কেবল 'উত্তোলন' পর্ব। ময়লাগুলারে তো রোদ্রে শুকাইতে দিতে হবে। কাঁচা ময়লা কি আর গাড়িতে তোলা যায়? ওজনে ভারি হয় না?"

আমি অবাক হয়ে বললাম, "ভাই, ময়লা কি ধান যে রোদে শুকাতে হবে? রোদ তো দূরের কথা, যেকোনো সময় বৃষ্টি নামবে। আর বৃষ্টি হলে তো এগুলো আবার ড্রেনেই চলে যাবে।"

তিনি এবার এক গাল হেসে পানের পিক ফেলে বললেন, "আরে ভাই, এইটাই তো ইকো-সিস্টেম! আমরা তুলব, বৃষ্টি নামলে আবার ড্রেনে যাবে, এরপর আবার টেন্ডার হবে, আমরা আবার তুলব। এইভাবে চাকা ঘুরলে তবেই না আমাদের পেটে ভাত জুটবে। আর এই যে আপনি লাফ দিয়ে দিয়ে যাচ্ছেন, এতে আপনার ব্যায়াম হচ্ছে না? জিম করতে তো আর টাকা লাগতেছে না!"

আমি হতভম্ব হয়ে ড্রেন থেকে উঠে আসা একপাটি ছেঁড়া জুতার দিকে তাকালাম। বললাম, "কিন্তু ভাই, এই পচা গন্ধে তো মানুষ অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে না?"

তিনি এবার আমার কাঁধে তার ভেজা গ্লাভস পরা হাতটা রাখতে গিয়েও রাখলেন না, বরং বিজ্ঞের মতো বললেন, "ভাই, গন্ধ কই পাইলেন? এইটা হইলো 'মাটির সুবাস'। ড্রেনের নিচে বছরের পর বছর পইড়া থাইকা এইগুলা এখন অর্গানিক সার হইয়া গেছে। আপনি বরং একটু জোরে জোরে শ্বাস নেন, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে। শহরের মানুষ তো এখন ড্রেনের গন্ধ সহ্য করতে পারে না, এইটা কি একটা জাতের লক্ষণ হইলো?"

উনার এই 'অর্গানিক থিওরি' আর 'জাতের লক্ষণ' বিষয়ক বক্তৃতা শুনে আমার মনে হলো—আমি আসলে কত আধুনিক আর শেকড়বিচ্ছিন্ন একজন মানুষ! আমি যে এই মহান 'উত্তোলন উৎসব' এবং ব্যায়ামের সুযোগকে অবহেলা করেছি, সেই অপরাধবোধে মাথা নুইয়ে বললাম—

"ও আচ্ছা ভাই... সরি!"